Mirage Of Life

১.

আমি সারজিল রহমান। আমার জীবনের একটা গল্প আজ তোমাকে শোনাতে চাই। মানুষের জীবন যে কতটা বিভ্রান্তকর তা আমি বলে বোঝাতে পারব না। মাঝেমাঝে খুব সহজ জিনিস অনেক জটিলতার সৃষ্টি করে, আবার কখনো কখনো খুব জটিল সমস্যাকে আমরা খুব সহজে সমাধান করতে পারি। আমি সাধারণত যখন কোন সিদ্ধান্ত নেই, তখন তা খুব একটা পরিবর্তন করি না। তাই বলে আমি ‘ওয়ান্টেড’ ছবির সালমান খান এর মতো ডায়ালগ দিচ্ছি না……

আমি ছোটবেলা থেকেই আমার কিছু আত্নীয়, কাজিন ও বন্ধু-বান্ধবী কে দেখছি যারা “অল্প বয়সে পিরিতি করিয়া” নিজেদের জীবনকে ট্র্যাজেডির নামান্তর করে রেখেছে। আমি কখনো ওদের কিছু না বললেও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, যত যাই হোক আমি ইউনিভারসিটি ফার্স্ট ইয়ারের আগে প্রেম করব না। আমি একজন ‘ওয়ান ওয়মেন মেন’, কাজেই ২ মিনিটের ‘টাইম-পাস’ওয়ালা প্রেম আমি কখনই করব না। সাধারণত এইচ.এস.সি. এর আগে যারা প্রেম করে তাদের বেশির ভাগই তাদের প্রেমকে পারফেক্ট এন্ড (বিয়ে) দিতে পারে না। আমার মতে তারা তাদের প্রেমানুভবটাকে অসম্মান করা ছাড়া আর কিছুই করছে না। আমি আমার ভালোবাসার অপমান করতে চাই না। তাই ইউনিভারসিটিতে এডমিশিন নিয়ে তারপরেই প্রেম করব বলে শপথ করেছি। এছাড়া ততোদিনে প্রেম করার মতো মানসিক পরিপুর্ণতাও চলে আসবে বলে আমি মনে করি।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা যা চাই বা যা চিন্তা করি তার সবটুকু তো সব সময় বাস্তবে হয় না। আমার স্কুল একটা বয়েজ স্কুল ছিল। দীর্ঘ ১০ বছর অতিক্রান্তের পর আমি যখন একটা কো-এড কলেজে ভর্তি হলাম, তাও যখন আমার মাঝে যৌবনের আবেগ ঘোড়ার মতো টগবগ করছে, তখন যদি আমার স্বপ্নের রাজকন্যার মতো কোন মেয়ের দেখা পাই, তাহলে কি আর ‘সেলফ-প্রমিজ’ এর কথা থাকে…  তাকে দেখেই তো আমি ফ্ল্যাট! এই মেয়ে কে তো গার্লফ্রেন্ড বানাতেই হবে, আমি তো সেরকম ডিটার্মাইন্ড। কিন্তু বললেই তো আর হল না, তার সাথে আগে আমার পরিচিত হতে হবে। কিন্তু সেই সাহসও তো আর হয় না। তখন আমি একটা বুদ্ধি বের করলাম, অনেক পুরনো কৌশল, ‘আগে তার বেস্ট ফ্রেন্ডদের পটাও’। এখান থেকেই শুরু হল আমার কাহিনী। তোমাকে এখন ধীরে ধীরে সব বলব। তাই প্রস্তুতি নিয়ে বসো।

২.

তোমাকে প্রথমে আমাদের ক্লাসের কয়েকটা চরিত্রের বর্ণনা দেই। এতে তোমার বুঝতে সুবিধা হবে।

* অরোরা রাহনুমা – সেই মেয়েটি যে আমাকে পাগল করলো……

* অদ্রিতা সিদ্দিকি – অরোরার বেস্ট ফ্রেন্ড।

* তাহসিন মেহনাজ – অরোরার আরেকজন খুব ভাল ফ্রেন্ড। অরোরা, অদ্রিতা আর তাহসিন সব সময় একসাথে চলে।

* নুঝাত চৌধুরী – টেলেন্টেড স্টুডেন্ট। অরোরার ভাল বন্ধু।

* সাফাত আনান –  আমার খুব ভালো বন্ধু। আমি বি সেকশনে আর আনান এ সেকশনে পড়ে।

* রাফিদ হাসানজাহিন তাবরেজ – আমার খুব ভালো দুইজন কলেজ ফ্রেন্ড।

* হাসিব বিন আমান – আমার ফেন্ড, আমার স্কুলে একই সাথে পড়তাম। তবে স্কুল লাইফে ওর সাথে খুব একটা খাতির ছিল না; এখনো খুব বেশি নেই অবশ্য…

৩.

নুঝাত আমাদের ক্লাস এর খুব টেলেন্টেড একজন স্টুডেন্ট, মেয়েদের মাঝে ও সবচেয়ে সেরা। উপরোন্তু ও অরোরার ভাল ফ্রেন্ড। তাই আমি ওকে সব সময় খুব রেস্পেক্টিভ নজরে দেখতেম। ও আমাকে খারাপ ভাববে বা ভাবতে পারে এমন কিছুই আমি কখন করতাম না। খুব ডিসেন্ট একটা ইমেজ নিয়ে ক্লাস এটেন্ড করতাম। ডিসেম্বের’ ০৯ অথবা জানুয়ারি’১০ এর দিকে একদিন টিফিন ব্রেক এর সময় আনান আমার ক্লাসরুম এ আসে। ব্রেকটাইম প্রায় শেষের পথে তখন।

আনান আমকে বলে, “চল দোস্ত আমার ক্লাসের সামনে যাই, তোর স্যার আসলে তুই চলে আসতে পারবি”।

ওর ক্লাসরুম থেকে টিচার্স কমন রুম স্পষ্ট দেখা যায়। যদি আমার ক্লাসের স্যার আসতে থাকে তবে আমি দেখতে পারব।

“চল, আমার কোন প্রবলেম নাই” আমি বললাম।

আমরা যখন যাচ্ছিলাম তখন নুঝাত ওর কিছু ফ্রেন্ডদের নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের দেখে ও ওর ফ্রেন্ডদের কি একটা যেন বললো, আমি তখন ঠিক বুঝতে পারিনি। পরে যখন আমি আমার ক্লাসে ফিরে আসছিলাম তখন সে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ওর ফ্রেন্ডদের বললো, “কিছু ফালতু ছেলেদের জন্য আমার কলেজে আসতে ইচ্ছে করে না, দেখছিস না ইচ্ছে কতোবার সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করছে।”

আমি তো শুনে থ! কি বলে! আমি খুব বেশি হার্ট হয়েছিলাম কারন অন্ততপক্ষে নুঝাতের কাছ থেকে এটা আমি আশা করিনি। পরে জানতে পারি অরোরাও নাকি আমাকে এরকমই মনে করে। তখন ও আমাকে মোটেও পাত্তা দিত না। আমিও ধরে নিয়েছিলাম এই মেয়ের পিছে আর দৌঁড়ে লাভ নেই। তখন আমার চালচলনে কি ধরনের পরিবর্তন এসেছিল তা আমি ঠিকভাবে বলতে পারব না, তবে লোকমুখে প্রচলিত আছে তখন নাকি আমি প্রেম নিবেদনে ব্যর্থ যুবকের ন্যায় উদাস থাকতাম। পরবর্তিতে সবাই আমাকে ‘ছেক খাওয়া সারজিল’ বলে খেপাতো। কি বিশ্রি অবস্থা……

৪.

হুমম… এবার একটি মজার কাহিনী… আগের ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে নুঝাত বুঝতে পারে যে আসলে ওর ধারনা ভুল, আমি এতটাও বাজে ছেলে না (কিছুটা বাজে অবশ্য)। এরপর থেকে ও আমার সাপোর্টিভ অনেক কাজ করলো যেমন ক্লাস প্রজেক্টের সময় ও আমার কন্সেপ্টকে সাপোর্ট করেছিল (যেখানে ক্লাস এর বাকি সবাই আমার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল)। যাই হোক্ম আমি ভাবলাম আমি বোধ হয় ওকে কিছুটা হলেও ইম্প্রেস করতে পেরেছি। কিন্তু হঠাত আমি উপলব্ধি করলাম, আমি নুঝাত কে নিয়ে কেন এত বেশি ফোকাসড হয়ে গেলাম, যেখানে আমার মুল উদ্দেশ্য অরোরা। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমি নুঝাতের থেকে একটু সরে সরে চলার চেষ্টা করলাম কিছুদিন। কিন্তু যা সর্বনাশ হওয়ার ততোক্ষনে হয়ে গেছে। একদিন আমি একটু লেট করে কলেজে গিয়ে দেখি নুঝাত এর পাশের সিট ছাড়া অন্য কোন সিট খালি নেই। তাই আমি বাধ্য হয়ে ওই সিটে বসলাম। আল্লাহ মালুম ও কি মনে করেছিল, ভাবটা এমন করলো যেন আমি ওকে প্রপোজ করে বসছি। ও কম্ফর্টেবল ফিল করছিল না ভেবে আমি ২ ক্লাস পর অখান থেকে উঠে আমার এক ফ্রেন্ডের সাথে সিট শেয়ার করে বসলাম। কিন্তু পরের দিন থেকে দেখি কাহিনী উল্টো! নুঝাত প্রতিটি দিন আমার ঠিক পাশের সিটে এসে বসে। এরপর তো কাহিনী…… আচ্ছা, একটু ব্রেক।

হঠাত খেয়াল করলাম যে অরোরা, অদ্রিতা, তাহসিন নতুন করে আমাকে পাত্তা দেওয়া শুরু করল, ওদের কথার বিষয় বেশিরভাগ সময় আমি। আমাকে শুনিয়ে অনেক কথাই ওরা বলে, যার বেশিরভাগ আমি ধরতে পারি না। ল্যাব থেকে বের হওয়ার সময় আগে মেয়েরা বের হয়, পরে ছেলেরা। ওরা ৩ জন বের হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, যখন আমি বের হই তখন ঠিক আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, ইচ্ছে করে। আবার হাঁটার সময় মাঝেমাঝে স্পীড কমিয়ে দেয়, আমি সতর্ক না থাকলে ওদের গায়ের উপর গিয়ে পড়ব। প্রত্যেকদিন একই ঘটনা। এখন আমাকে প্রতিদিন ল্যাব থেকে রোবটের মতো হেঁটে ক্লাসে আসতে হয়। যাই হোক! আমি এনজয় করি। কারন আমি তো চাই ওদের আলোচনার বস্তু হয়ে থাকতে। তার উপর ২য় সেমিস্টারে আমার রেসাল্ট খুব ভাল হয়েছিল। সবাই আমাকে রেস্পেক্টেড ভিউতে দেখে, অরোরাও পাত্তা দেয়… সব মিলে আমি তো পাংখা!!!

৫.

হঠাত নুঝাত নতুন সমস্যার সৃষ্টি করল। আমি, রাফিদ, জাহিন আর হাসিব একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। অরোরাও ওর ফ্রেন্ডদের সাথে আমাদের পাশের বেঞ্চে বসে আড্ডা দিচ্ছিল।

এমন সময় নুঝাত এসে অরোরাকে বলে, “এই সারজিল ছেলেটা কি আমি বুঝি না, কিছুদিন আমার পিছনে ঘুরে, কিছুদিন তোর পিছে ঘুরে…”

কথাটা শুনে আমার প্রছন্ড রাগ উঠে। আমার ইচ্ছে করছিল তখন গিয়ে নুঝাতের গালে একটা কষে চড় বসিয়ে দেই। ভাগ্য ভালো তার আগেই জাহিন আর রাফিদ আমাকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। পরে গিয়ে ওদের চেহারা দেখে মনে হল না যে কিছু হয়েছে, ওদের আলোচনার বিষয় তখনো আমি, পার্থক্য হল আলোচনা এখন নেতিবাচক। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমি তার পরের দিন একটু দূরে অন্য সিটে বসি। পরে যখন টিফিন ব্রেকে আমি ওদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন অরোরা ফিজিক্সের একটা অঙ্ক করছিল।

আমাকে আসতে দেখে তাহসিন ওকে বলে, “ওই দেখ, সারজিল তোকে হেল্প করার জন্য চলে আসছে।”

ব্যপারটা আমার কাছে খুব মজাই লাগল। আমি তখন বুঝতে পারলাম যে আমি এখনও লাইনে আছি……

সাধারনত বুধবার শেষ পিরিওডে আমাদের একটা স্পেশাল ক্লাস থাকে, ক্লাব এন্ড সোসাইটি। এই পিরিওডে আমরা গান গেয়ে, নেচে, কৌতুক বলে মজা করি। মার্চের শেষ বুধবার আমরা সবাই গানের তালে তালে নাচছিলাম।

এমন সময় অরোরা এসে আমাকে বলল, “তুমি বলে ভাল গান গাও, গেয়ে শোনাও না আজকে।”

আমি তো খুশিতে আত্নহারা! ‘এই সুযোগ’ ভেবে বুকে সাহস নিয়ে গান ধরলাম……

ট্র্যাকঃ অহনা, আর্টিস্টঃ সাবকনশিয়াস। শুনে দেখ, বুঝতে পারবে……

৬.

৭ এপ্রিল, আমার সুখের দিন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এই দিনে। এইদিন আমি একটু আগেই কলেজে পৌঁছে গিয়েছিয়াম। গিয়ে দেখি ক্লাসে শুধু অরোরা বসে আছে, আর কেউ নেই। দুর্দান্ত পরিবেশ, আমিও এটাকে বৃথা যেতে দিলাম না। আমি ওর সাথে কথা বলা শুরু করলাম।

কথার ফাঁকে ও ডাইরেক্ট জিজ্ঞাসা করে বসল, “তুমি কি আমাকে পছন্দ কর?”

এমন ডাইরেক্ট কথা কখনই আশা করিনি। আমি পুরাই থতমত খেয়ে গেলাম। ফলাফল বাজে উত্তর। আমি বললাম, “ঠিক তা না, তবে এটুকু বলতে পারি যে তুমিই আমার ফার্স্ট ক্রাশ।”

কথাটা শুনে ও হাসতে শুরু করল। তবে ওর রেএকশন ছিল আমার অনুকূলে। এপ্রিল আর মে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দু’টি মাস ছিল। যেই আমি প্রচন্ড ঘরকুনো, সেই আমি সুযোগ পেলেই বাইরে বের হই। কোন ডেস্টিনেশন থাকে না, আসল ডেস্টিনেশন তো কেবল আমি জানি, আর কেউ না… সাধারনত গার্লফ্রেন্ড পাওয়ার ফার্স্ট স্টেজে যা যা হয় আর কি। অনেক অর্থ আর সময় দিতে হয়। এসময় আমি রিয়ালাইজ করলাম যে আমি এতদিন কতটা কৃপণ ছিলাম, কাউকে খাওয়াতাম না। অরোরাকে সপ্তাহে অন্তত একবার খাওয়াতাম। পকেটের বারোটা বাজতো, কিন্তু আমি তা খুব এনজয় করতাম…… হে হে হে… আঙ্গুর ফল খুব মিষ্টি রে……

৭.

মে এর শেষের দিকে কোন এক অজানা কারনে অরোরা আমার উপর রাগ করে, আমার ফোন কল রিসিভ করে না। আমি ফোন করলে কেটে দেয়। আমি অনেক চেষ্টা করেও কোন কারন বের করতে পারিনি। ওই সময় আমাদের কলেজে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। তাই আমিও পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছিলাম। অরোরার সাথে আমার জুন মাস পর্যন্ত কোন কথা হয়নি।   ২ জুলাই হঠাৎ অরোরা আমাকে ফোন দেয়।

আমি, “হ্যালো। কি খবর তোমার? কেমন আছ?”

“এইতো আছি মোটামুটি। তুমি?”

“আমার খবর কি আর তুমি নাও নাকি? তা এতদিন পর কি মনে করে?”

“তোমাকে একটা কথা বলবো, যদি তুমি কিছু মনে না কর।”

“আমি আবার কি মনে করব? বলো দেখি, শুনি।”

“সেইদিন নুঝাত আমার বাসায় এসেছিল। ও আমাকে তোমার সম্পর্কে একটা কথা বললো।”

“ও আবার আমার সম্পর্কে কি বললো? ও কিছু জানে নাকি?”

“যদি কথাটা এখন আমাকে বলতো তাহলে বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু তখন আমি জানতাম না এ ব্যাপারে।”

“কোন ব্যাপার?”

“ও আমাকে বললো যে তুমি নাকি সব মেয়েদের পিছনে ঘুরে বেরাও। কয়েকদিন প্রেমের অভিনয় কর, এরপর ছেড়ে দাও।”

“হা হা হা। কি হাস্যকর কথা। তা আমাকে ওর এরকম মনে হওয়ার কারনটা কি? আমি কি ওর সাথেও প্রেমের অভিনয় করেছি নাকি?”

“না। আসল ব্যাপারটা অন্য জায়গায়। আসলে নুঝাত তোমাকে পছন্দ করে। তুমি আমার সাথে ঘুরে বেরাও এটা ওর পছন্দ না। তাই আমাকে তোমার নামে উলটা পালটা কথা বলছে।”

“আর তুমি তা বিশ্বাসও করলা?”

“সরি। আর এরকম হবে না। ও আমার খুব পুরানো বন্ধু। ও যে আমার সাথে এরকম মিথ্যে বলবে তা আমি কখনও ভাবিনি।”

“দেখছো আমার জন্য কত মেয়ে পাগল? তোমার উপর মুরুব্বিদের দোয়া আছে। নাহলে কি আমার মত বয়ফ্রেন্ড পেতা?”

“তাই না? আচ্ছা, এই ডায়ালগটা খুব চেনা চেনা লাগতেছে। কথা থেকে কপি করছ তুমি?”

“থাক এ ব্যাপারে আর কথা না বলি।”

“নিজে ঠেকে গেলে সবাই এড়াই চলে। বুঝি বুঝি।”

আর এই একটা ফোনকল আবার সব নরমাল করে দিল আমাদের মাঝে…

৮.

একদিন আমি ওর সাথে টি.এস.সি. তে বসে ছিলাম। ও হঠাত আমাকে বলল,

“দেখ, আমি মনে করি ইন্টারমেডিয়েট লেভেল পার করার আগে একটা ছেলে বা একটা মেয়ের সেই মেন্টাল মেচুরিটিটা আসে না যা দিয়ে তারা তাদের প্রেমকে একটা লম্বা সময় ধরে টেনে পারফেক্ট ফিনিশিং দিতে পারবে। আমার মনে হয় আমাদের আরও কিছুদিন ওয়েট করা দরকার।”

কথাটা শুনে মোটেও কষ্ট পাইনি বললে মিথ্যে বলা হবে, কিন্তু সত্যি বলছি, কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি ভাল লেগেছিল। কারন ও আমার মনের কথাটাই বলল, যা আমি ভেবে রেখেছিলাম ছোটবেলা থেকে। ওর কথা আমাকে আমার সেলফ-প্রমিজের কথা মনে করিয়ে দিল। আমরা দুজনেই সিদ্ধান্ত নিলাম প্রেম করব, কিন্তু এইচ.এস.সি. পাসের আগে নয়। আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা তখন কিছুটা জটিল আকার ধারন করল, বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিন্তু ভালোবাসার চেয়ে কম। জুলাই এর শেষের দিকে একদিন আমরা রাইফেলস স্কয়ার (বর্তমানে সীমান্ত স্কয়ার) এর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম এমন সময় আঙ্কেলের (অরোরার বাবা) আগমন। আবার নাটক, আবার ক্লাইমেক্স! এখন যেহেতু আঙ্কেলের সামনে পরে গেছি কিছু তো একটা বলতেই হবে। অরোরা খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল। আমিও কি করব বুঝতে পারছিলাম না। হঠাত নিজের অজান্তেই ১০০% ভাবের সাথে আঙ্কেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল, আমি সারজিল রহমান।” আঙ্কেলও ভদ্রতার খাতিরে হ্যান্ডসেক করতে করতে নিজের পরিচয় দিল (না দিলেও পারতেন, আমি তো জানিই …) এরপর উনি কিছু জিজ্ঞেস করতেও পারলেন না, অরোরাকেও কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে হল না। একেই বলে, ‘এক ঢিলে সব পাখি শেষ!’  এভাবে আঙ্কেলের সাথে পরিচয় হয়ে গেল। আমি তো সেই রকম খুশি। কারন আমি তখন রিলেশন করবো না বলেছি, পরেও যে করবো না তা তো বলিনি। পরের জন্য আঙ্কেলকে ইম্প্রেস করে রাখতে দোষ কি?

সেপ্টেম্বরে ঈদের পরের দিন অরোরা ওর ফুল ফ্যামিলি নিয়ে কক্সবাজার যাবার প্ল্যান করল। কিন্তু আঙ্কেলের কাজ থাকায় ওরা একদিন চিটাগং এ স্ট্যা করে। আমার দেশের বাড়িও চিটাগং। ঈদের সময় বলে আমিও তখন ওখানে ছিলাম। ওরা হোটেল পেনিন্সুলাতে উঠে যেটা আমার বাসা থেকে একদম কাছে। ওইদিন আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হোটেলের আসেপাশেই ছিলাম। ওরা যখন চেক-ইন করছিল তখন আমি ওদের সাথে দেখা করতে গেলাম। এতে বেনিফিটও ছিল, আমি ওর ফুল ফ্যামিলির সাথে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম। মনে মনে আশা করছিলাম ভবিষ্যতে এমন আরো সুযোগ পাব ওদের সাথে ইন্ট্যারেক্ট করার জন্য। মানুষ কি সাধেই বলে, “শ্বশুরবাড়ি মধুর হাড়ি।”……

৯.

১ অক্টবর ছিল আমাদের (আমি, অরোরা আর আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড) জন্য একটা আজীবন মনে রাখার মতো দিন। এই দিনের কথা আমি কখনই ভুলতে পারব না, চাইলেও না। এটা ছিল ‘ওয়ান্স ইন এ লাইফ টাইম’ টাইপের পার্টি। ছেলেরা স্যুট পড়া ছিল, আর মেয়েরা পড়া ছিল শাড়ি। আর পার্টিটা ছিল হোটেল ওয়েস্টিনে। হেই হেই, ওয়েট! মনে করো না যে আমি একাই পুরো পার্টি দিয়েছি, যার যার বিল সে সে পে করেছিল। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই; আপনজনদের সাথে কিছু ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটানো। পার্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ মজা হয়েছিল, বিশেষ করে খাওয়া ছিল অসাধারন। আমরা আসলেই ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটিয়েছিলাম…… বিল আসার আগ পর্যন্ত… :P

সত্যি বলছি, জুলাই মাসে যেই নীতিবাক্যের উপর ভিত্তি করে আমরা রিলেশন করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ডিসেম্বরে এসে তার ৯০% এর উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। তখন মনে হচ্ছিলো এই সব টিপিকাল নীতিবাক্য গার্ডিয়ানদের মুখে মানায়, আমার না। আমার মনে হয় অরোরাও তখন একই কথা উপলব্ধি করেছিল। একদিন সেই টি.এস.সি. তে বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন হঠাত আমি অরোরাকে বললাম,

“আচ্ছা, আমার মনে হয় আমাদের এই আন্সার্টেইন রিলেশনসিপটাকে একটা সার্টেইন স্টেজে নিয়ে যাবার সময় হয়ে গেছে, তোমার কি মনে হয়?”

“আমারো তাই মনে হয়।” একটু হেসে অরোরার জবাব।

সবচেয়ে মজার বিষয়টি কি জানো? এটাই ছিল ওকে আমার প্রপোজ করার স্টাইল… কি জঘন্য!… হা হা হা…… ২৪ ডিসেম্বর, অরোরার বার্থডে ছিল। এই উপলক্ষে ফোর সিসন্স রেস্টুরেন্টে পার্টি ছিল। আসল উপলক্ষ ছিল ওর কাজিন যারা আমেরিকা থেকে ওই সময় দেশে এসেছিল। তাদের জন্যই এতো বড় পার্টি। যদিও এটা ফ্যামিলি পার্টি ছিল, তাও আমাকে ইনভাইট করা হয়েছিল। অরোরা আমাকে বলেছিল যে ওর কাজিনদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিবে। গিয়ে দেখি পার্টিতে অরোরার মা এবং খালাও আছে। আমি তো খুবই বিব্রতকর ফিল করছিলাম। কারন পার্টিতে ওর আর কোন ফ্রেন্ডও নেই। আমি ১০০% সিওর ওইদিন সবাই বুঝেছিল যে ওর সাথে আমার অ্যাফেয়ার আছে। তবে আন্টি সব বুঝেও কোন রেঅ্যাক্ট করেননি। তার ধৈর্য্য ও অপ্টিমিসিজমকে আমি সালাম জানাই। কোন রেঅ্যাক্ট করলে ঘটনা অনেক খারাপও হতে পারতো।

১০.

জানুয়ারির শুরুর দিকে অরোরা সপরিবারে বাসা সিফট করে ধানমন্ডি ১৩/এ তে চলে আসে। এতে আমার জন্য ওর সাথে দেখা করা আরও সহজ হয়ে যায়। আমার বাসা থেকে ওর বাসা হেঁটে যেতে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগতো। তাই দেখা করা আগের থেকে অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। আমি খুব এনজয় করছিলাম, সুন্দর একটা ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখছিলাম। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে একদিন অরোরা আমাকে একটা নিউজ দিল যেটা শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ওরা ইমিগ্রেন্ট ভিসা পেয়েছে এবং এইচ.এস.সি. এর পর জুলাই এ ইউ.কে. চলে যাচ্ছে। এ যেন আমার জন্য বিনা মেঘে বজ্রপাত। আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমি জানতাম যে এই সিদ্ধান্ত বদলানোর কোন এখতিয়ার আমার নেই, তাও আমি এটা কোনভবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। শুধু মাত্র নিজের মনকে বুঝ দেবার জন্য সিদ্ধান্ত নিলাম, এই বিষয়ে কোন কথাই আমি বলব না। খবরটা পাবার পর আমি খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম। পড়াশোনাই মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর নিজেকে কিছুটা শক্ত করতে পেরেছিলাম। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে ও দেশে যতদিন আছে, ততোদিন সুন্দর কিছু সময় কাটাবো। লং ডিস্ট্যান্স রিলেশনসিপ কখনই কাজ করে না। ঠিক তার পরের মাসের শুরুতেই এইচ.এস.সি. পরীক্ষা। তাই সব ভুলে পড়ায় মন দিলাম। এপ্রিল-মে পরীক্ষার পিছনেই শেষ। জুনে কিছুটা ফ্রি টাইম ছিল। আমি আমার সর্বাত্নক চেষ্টা করেছি আমার অবসরের সবটুকু ওকে দিতে। জীবনটিকে তখন খুব বিভতস মনে হচ্ছিল। জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে আমি আল্লাহ তাআলার কাছে ফিরে আসার উপায় পাবার জন্য প্রার্থনা করছিলাম।

২ জুলায়, শনিবার। এই গল্পের শেষ অধ্যায়। ওদের ফ্লাইট ছিল রাত ১১ টায়। বিকালের পর সবাই খুব বেশি ব্যাস্ত থাকবে ভেবে আমি সকাল বেলা ওর সাথে শেষবারের মতো দেখা করতে গেলাম। আমি ওর বাসার নিচে দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। ও আসে, কিন্তু ব্যস্ত থাকায় আমাকে ২৫ মিনিটের বেশি সময় দিতে পারেনা। তাও যথেষ্ট ছিল। কারন সেই ২৫ মিনিটের ২০ মিনিট দুজনই চুপ ছিলাম, সত্যি বলতে বাক্যহারা ছিলাম। আমাদের বলার কিছু ছিল না। “ভাল থেকো” বলে চলে আসার সময় মনে হচ্ছিল এটা একটা দুঃস্বপ্ন, অন্য কিছু না। কিন্তু মাঝেমাঝে যে বাস্তব দুঃস্বপ্নের চেয়েও বিভৎস হয়……

১১.

সবশেষে একটা কথাই আমি রিয়ালাইজ করলাম। আর তা হল আমার সেই সেলফ-প্রমিজটা ঠিক রাখলে এতো কষ্টের কিছুই হতো না। আমার সেই ফিলোসফি সেন্ট পারসেন্ট সত্য। ইমোশনের পাল্লায় পরে আমার রঙ্গিন জীবনটিকে সাদা-কালো করার চেষ্টা করেছি আমি। আবার এ কথাও সত্য যে অরোরার সাথে অ্যাফেয়ার করার কারনেই আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু মুহুর্ত পেয়েছি। তাই শপ্তক সানজিদ এর একটা কথা দিয়ে শেষ করবো,

ইমোশনলেস মানুষেরা হয়তো বা সুখেই থাকে…… কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ থাকে বলে মনে হয় না……

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ গল্পে ব্যবহৃত ‘আধুনিক গুরুচণ্ডালি দোষ’ (বাংলা-ইংরেজি ও প্রমিত-কথ্য ভাষার সংমিশ্রণকে) ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

A story by Ahnaf Tabrez Nuhel ©

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s